শনিবার, ৮ জুলাই, ২০১৭

‘রক গায়কের জন্য প্রার্থনা’ পাঠ ও প্রতিক্রিয়া




রকগায়কের জন্য প্রার্থনা

এশার আযান শেষে, রাত বাড়লে রেডিওতে
রক মিউজিক জমে ওঠে

ভ্রম-করাতকলে সারারাত 'রে একটানা
করাত চালায় রক গায়কেরা

এতো শূন্যতা তুমি করতল ভরে
নিয়ে এসছো মানুষ-
এন্টেনা এডজাস্ট করো, চ্যানেল টিউন
করে নাও, শোনো আর উপভোগ করো
পাথরচাষিরা শোনো চিৎকার, রক মিউজিক

মাঝেমাঝে খুলে যাবে তালা, স্তব্ধ ঐকতান
ভেসে আসবে ড্রামের কাঠিতে
তোমরা তাদের জন্য প্রার্থনা করো, যেন এই
লম্বা সফর শেষে, মহাকাল পর্যটন শেষেও
এমন করাতকল কখনোই স্থবির না হয়

চোখের সামনে কবিতাবই ধরলে হতাশ হতে চাই না। একটা অবিরল হা-পিত্যেশ থেকে কবিতার মুখোমুখি হওয়া আমার জন্য, কবিতাবইটি, চাই একটা কবিতা তার জঠরে রাখুক। যেটি আমাকে পুরোদস্তুর তার করায়ত্বে নেবে। ‘রক গায়কের জন্য প্রার্থনা’ কবিতাটি ‘রক গায়কের জন্য প্রার্থনা’ কবিতাবইয়ের তেমন একটি কবিতা। অর্থ্যাৎ ভালোলাগা কবিতা পড়ার মধ্য দিয়েই আমি রাতুল রাহা’র কবিতাবইটি নিয়ে কিছুমিছু বলা শুরু করছি। কবিতাটিতে এমন একদল শিল্পীর জন্য প্রার্থনা করবার কথা বলা হয়েছে, যারা কোলাহলমুখর অথচ নান্দনিক, ড্রামের বুকে কাঠি ঠুকে দ্রিম দ্রিম শব্দ ওঠায় আর তুমুল গলা চড়িয়ে নিজেদের উপস্থিতির জানান দেয়। মানুষের মৃদুমন্দ নান্দনিক রূচিতে ‘রক মিউজিক’ যতখানি কার্য্যকর ধাক্কা দিয়েছে, তার কিছুটা কবিতায় এলিয়টের ওয়েস্ট ল্যান্ড, এবং গদ্যে জয়েসের উইলিসিস করেছিল। ‘রক মিউজিক’ মিউজিকের একটি প্রতিষ্ঠিত ঘরাণা, আর সে হিসেবে এর কার্য্যকারীতাও বহু বিস্তৃত। সাকূল্যে ‘রক মিউজিক’ গায়করা হলেন এক রকম ডিস্টার্বিং আর্টিস্ট, যারা বাঁধা-বন্ধনহীনভাবে মানব সমাজের আবেগ-অনুভূতি, সঙ্গতি-অসঙ্গিতিগুলোর বয়ান করেন উচ্চস্বরে। “এশার আযান শেষে, রাত বাড়লে রেডিওতে/ রক মিউজিক জমে ওঠে” অর্থাৎ রাতুল এখানে এমন সময়ের দিকে তাকিয়েছেন, যখন মানুষ বিশ্রামের জন্য তৈরী হয়। পরিচিত একঘেঁয়ে জীবন পদ্ধতিতে সেঁটে যাওয়া মানুষদের সে রক গায়কদের মুখোমুখি করতে চায়, তারপর “ভ্রম-করাতকলে সারারাত 'রে একটানা/ করাত চালায় রক গায়কেরা।” বিরামহীনভাবে বিদ্ধ হতে থাকুক মানুষেরা, সেই সব মানুষেরা, যারা এতো শূন্যতা করতল ভরে নিয়ে এসেছে। অনেকতর তালা তখন খুলে যাবে, স্তব্ধ ঐকতান শুনতে পাবে ড্রামের নিরলস কাঠিতে। কবি রাতুল রাহা অন্তিমে মহাকাল পর্যটনে আসা মানুষদের উদ্দেশ্যে একটি সহৃদয় দাবী উত্থাপন করেছেন, যেন এমন করাতকল কখনোই স্থবির না হয়, এই প্রার্থনা যেন সকলে করে। খুবই মানবিক একটি চাওয়া, এবং কবিতাটি শেষ পর্যন্ত গভীর জীবনবোধের।     

কবিতা নিয়ে আলাপকালে আমি কবিতার বাইরেও একটি উপাদানকে গুরুত্ব দেই, তা হলো স্বয়ং কবিতার স্রষ্টাটিকে। শুধুমাত্র পাঠ (টেক্সট) নিয়ে আমি খুশি থাকতে পারি না; ‌র‌্যাঁবো পড়াকালে আমি তার যাপনকে অনুভব করতে চাই, তেমনি বিনয় পড়াকালে দেখি হারিকেন হাতে বিনয় দাঁড়িয়ে আছেন। আমি এমনভাবেই কবিতা পাঠ করে থাকি। যাপনের সারাৎসার কবিতাকে, তার স্রষ্টাসমেত আমি ধরতে চাই। ‘রক গায়কের জন্য প্রার্থনা’ কবিতাবইয়ের কবি ‘রাতুল রাহা’র সাথে সম্প্রতি আমার দেখা হয়েছে, বেশ কতগুলো দিনও একত্রে যাপন করেছি। কবি রাতুল’কে একজন সংগীত শিল্পী হিসেবে ভাবতে আমার ভালোলাগে, সংগীত সে অত্যন্ত ভালোওবাসে। তথ্যটা এ কারণে দেয়া, যে, তার কবিতায় সংগীতের প্রবহমানতা বর্তমান, একটা স্রোতস্বিনী নিয়ত বয়ে যাচ্ছে যেন। জীবন সম্পর্কে দার্শনিক দৃষ্টিকোন থেকে, সে সম্ভবত একজন নিরিশ্বরবাদী, মানুষের প্রতি তার সাকূল্য ভাবনাটা আমার কাছে পরিষ্কার নয়, কিন্তু সে একজন প্রেমিক, ভয়াবহ প্রেমিক। আর তাই ‘রক গায়কের জন্য প্রার্থনা’ একটি আপাদমস্তক প্রেমের কবিতার বই বলে যে আমার মনে হওয়া, তা একটি যৌক্তিক ভিত্তিও পায়। রোমান্টিকদের একটি লক্ষণ তার মাঝে বর্তমান, সেটি হলো, সমগ্র মহাবিশ্বটা যেন তাকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হচ্ছে, সে-ই এক ও অদ্বিতীয়, তার আপন সুরমাধুরী মিশিয়ে একাকি গান গেয়ে যাচ্ছে। ‘রক গায়কের জন্য প্রার্থনা’ থেকে একটি কবিতা পড়া যাক:

আমার পাশে দাঁড়াও, আমি মনুমেন্ট

আমার পাশে দাঁড়াও, আমি মনুমেন্ট, আমি আইফেল টাওয়ার হয়তোবা
ছবি তুলো, নিজের মতন করে যেভাবেই চাও হাসিভরা, বাঁকা হয়ে
তুমি আমার পাশে দাঁড়াও, আমি ভেজাল ভর্তি গাছ, না চাইলে
দাঁড়িও নাতফাতেই থাকো, কখনো তফাত থাকা ভালোসংক্রামক
রোগ থাকে যদি আমার শরীরে, মনে, গোপনে বিজনে

আমার পাশে দাঁড়াও, আমি পৃথিবীর আদিম পাথর, আমার শরীরে
দ্যাখো গুহাবাসী বাইসন এঁকেছে, সেইসব বাইসন মাঝেমাঝে জ্যান্ত হয়ে
ওঠে আর তীর বর্ষার ফলা নিয়ে তার পিছে ধাওয়া করে ফেরে
শিকারীরানারী পুরুষ, তাই এই মনুমেন্ট তাই এই আইফেল
টাওয়ার, আর এই সুআদিম পাথরের পাশে কোথাও সরল কোনো
দাঁড়ানো মানুষ দেখবে না


কবিতা বিষয়ক আলোচনায় তুলনামূলক আলোচনার একটি পদ্ধতি প্রতিষ্ঠিত। একজন কবির টেক্সট ভাঙ্গার জন্য অন্য একজন কবির টেক্সটের স্বরণাপন্ন হতে হয়, তারপর দুই কবির সাদৃশ্য-বৈসাদৃশ্য নিয়ে চুলছেড়া বিশ্লেষণ। আমি এই পদ্ধতিতে আলোচনায় আগ্রহী নই। কবিতা কাব্যিক উত্তরাধীকারসূত্রে প্রাপ্ত একটি শিল্প, তাই লক্ষণবিচারে একজন কবির কবিতা অপর কবির কবিতার সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ বা বৈসাদৃশ্যপূর্ন হয়ই। একটা নির্দিষ্ট মাত্রায় জগতের সকল কবিই অপরাপর কবিদের প্রভাবযুক্ত, আর সেই প্রভাবকে একজন কবি তার নিজস্বতা দিয়ে যখন ছাপিয়ে ওঠেন, তখনই সেই কবি তার নিজস্ব জগত নির্মাণ করেন। তাই এই টক্কর পদ্ধতিতে আলোচনা করতে গেলে আমি মনে করি, দৃষ্টি কিছুটা ঝাপসা হয়ে ওঠে, আলোচ্য কবির প্রতি মনোযোগ বিক্ষিপ্ত হয়ে যায়। যদি একজন কবির কবিতা সততার লক্ষণযুক্ত হয়ে থাকে, তাহলে তার পাঠটি আলোচনার জন্য আমি শুধুমাত্র তার দিকেই দৃষ্টি প্রসারিত রাখতে চাই। তার জীবনবোধের সাথে কবিতার সম্পর্ক বুঝেতে চাই। এই আলোচনাটি তেমন-তেমনই একটি প্রচেষ্টা। আলোচ্য বইটি রাতুল রাহা’র প্রথম বই। ভাষা ব্যবহারের দিক থেকে অভিনব কোন চেষ্টা-চরিত্তির কবি করেননি। সময়ের স্বাভাবিক স্বরেই তার কবিতার বুনন, শব্দ ভান্ডারও সীমিত। বিষয়বৈচিত্রের দিক থেকেও আকাশ-পাতাল চষে ফেলবার কোন আয়োজন নেই। নিজস্ব প্রতিবেশ ও তার মুগ্ধ হৃদয়ের মিশেলেই অধিকাংশ কবিতার দেহ-মন গঠিত। সুক্ষ জীবনবোধ আর হৃদয়ের অকৃত্তিম ব্যবহারই তার কবিতার প্রকট সম্পদ।


কেয়া চৌধুরীর বিকেলযাপন

ওক কাঠের একটা বেঞ্চের উপর পা দুলিয়ে বসে বিকেলযাপন করছে
কেয়া চৌধুরী আর সূর্যাস্তের নরম আলোয় পরখ রে নিচ্ছে
মাইনফিল্ড

প্রজাপতি, তুমি কী প্রকারে মুখরিত হও? আমাকে ঈর্ষা জাগিয়ে
নেচে বেড়াচ্ছো বিভিন্ন তালে। আমিও তোমার এই নাচের মুদ্রা
শিখে ফুলে ফুলে উড়ে যেতে চাই

এইসব দৃশ্যের ভেতর দিয়ে একটানা বেজে চলেছে লেড জেপেলিন।
হাত থেকে সে পড়ছে ফুল, প্রেম এবং লিরিক; ম্যাজিকম্যান ভুল
করছে ট্রিকে, ফ্লায়িং রুট থেকে ক্রমশ রে যাচ্ছে উড্ডীন বিমান,
মুহুর্মুহু ভেঙে পড়ছে জানালার কাঁচ ব্যক্তিগত ইগোর মতোন

আর সন্ধ্যা ঘনিয়ে এলে রকগান শেষে ধীরপায়ে হেঁটে হেঁটে
মাইনফিল্ড পেরিয়ে যাচ্ছো তুমি
   
কোন কোন কবিতায় ‌একাধিক ইংরেজি শব্দের ব্যবহার দেখা যায়। কিন্তু লক্ষ্য করলে দেখা যায়, এগুলোর বেশিরভাগই বিশেষ্য পদ। কোন স্থানের নাম বা কোন ব্যক্তির। এগুলো কবিতার কোনরকম ক্ষতি না করে বরং এক ধরনের বিস্তৃতি এনে দিয়েছে। চমকে দেবার মতো কাজও রয়েছে তার কবিতার অভ্যন্তরে, “মুহুর্মুহু ভেঙে পড়ছে জানালার কাঁচ ব্যক্তিগত ইগোর মতোন”- জানালার কাঁচ ভাঙ্গার দৃশ্যের সাথে যেভাবে ব্যক্তিগত ইগো ভাঙ্গার বিষয়টিকে উপস্থাপন করা হয়েছে, শব্দকল্প ও দৃশ্যকল্পে তা সমানভাবে উত্তির্ণ। চিত্রময়তা তার কবিতার আর একটি উপাদান। “এইসব দৃশ্যের ভেতর দিয়ে একটানা বেজে চলেছে লেড জেপেলিন।/ হাত থেকে সে পড়ছে ফুল, প্রেম এবং লিরিক; ম্যাজিকম্যান ভুল / করছে ট্রিকে, ফ্লায়িং রুট থেকে ক্রমশ রে যাচ্ছে উড্ডীন বিমান, / মুহুর্মুহু ভেঙে পড়ছে জানালার কাঁচ ব্যক্তিগত ইগোর মতোন” এখানে চিত্রগুলো ও তার প্রবাহমানতা এমন সুবিন্যস্থ যে, অনেকগুলো দৃশ্য যেন একটার পর একটা ভেসে যাচ্ছে চোখের সামন দিয়ে। একাধিক কবিতায় এই রকম দৃশ্যকল্পের সাথে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেয় রাতুল। ‘চুরি’ ‘সৃষ্টি’ ‘মানুষের সংসর্গ ছেড়ে’ ‘প্রেমিকার মৃতুতে’ ইত্যাদি কবিতাগুলো বইয়ের শ্রীবৃদ্ধি করেছে নিঃসন্দেহে। তবে এমন কিছু লেখাও আছে, যেগুলো মনে হয়েছে দায়সারা গোছের, যেমন-‘ঝিঙা ফুল’ ‘আরশি’ ইত্যাদি।

‘রক গায়কের জন্য প্রার্থনা’র কবিকে বুঝবার জন্য আমরা আরো একটি কবিতা পাঠ করি:

শহর থেকে দূরে

শহর থেকে দূরে কিছু কিছু ব্রিকফিল্ড আছে
কিছু কারখানা এবং আরও কিছু কারখানা
সেই ব্রিকফিল্ড এবং কারখানা থেকে
প্রতিদিন বিষাক্ত ধোঁয়া ও বৈর্জ্য পদার্থ নির্গত হয়
যা নিঃসন্দেহে প্রকৃতি ও সভ্যতার জন্য ক্ষতিকর

তবে শহর থেকে দূরে, সবচেয়ে দূরে থাকে কবি

শহরের নাগরিক কবি এভাবেই তার দূরমন নিয়ে দূরে থাকেন। তার যাপনের সাথে এভাবেই সংঘর্ষে লিপ্ত হয় তার হৃদয়। আর এমন দোলাচলেই কবিকে জীবন যাপন করতে হয়, খাপ না খাওয়া দূরগামী মন তাকে কখনো নিস্তার দেয় না। এরই ভেতর কবিকে একটা হৃদয় নিংড়ানো পথ তৈরী করতে হয়, যে পথে ঘটে তার মুক্তি। মুক্তি কি আদৌ ঘটে?  


কবিতাবই: রক গায়কের জন্য প্রার্থনা
কবি: রাতুল রাহা
প্রকাশক: চৈতন্য
প্রকাশকাল: ২০১৬

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন